Wednesday, March 4, 2026

অগ্রদ্বীপ কালকাপুর কালি মা

মায়ের নির্দেশ পেয়ে আর বসে থাকেননি সেই ব্রাহ্মণ। মায়ের ডাক কি কখনও উপেক্ষা করা যায়? একা একাই তিনি ছুটে গেলেন নদীর পাড়ে। “জয় মা!” বলে খরস্রোতা তটিনীর জলে ডুব দিলেন। হাতড়াতে লাগলেন চারিদিক। সময় কেটে যায়… শ্বাস ভারী হয়ে ওঠে… বুকের ভিতর চাপা যন্ত্রণা। তবে কি তিনি ব্যর্থ হবেন? তবে কি মা মিলবেন না? ঠিক সেই মুহূর্তে— নদীর তলদেশে দেখা দিল এক অপূর্ব জ্যোতি! ঘন কালো শিলায় খোদিত এক অপরূপ মাতৃমূর্তি! তিনি তুলে আনলেন সেই মূর্তি। কিন্তু স্বপ্নে তো মা বলেছিলেন— তিনি কালী রূপে পূজিত হবেন! এ যে অষ্টভুজা মহিষাসুরমর্দিনী! মহিষের পৃষ্ঠে আরোহিনী, অসুরবধে রত মাতা দুর্গা! কিন্তু রণক্ষেত্রে তো তিনিই রূপ বদল করেছিলেন বারবার। তিনিই দুর্গা, তিনিই কৌশিকী, তিনিই কাত্যায়নী, তিনিই গৌরী। তিনিই চণ্ডিকা, তিনিই কালী, তিনিই কালরাত্রি! সেই দিন থেকেই কুমরি নদীর তীরে সেই গ্রামে মা অধিষ্ঠিত হলেন— দুর্গা রূপে, অথচ কালিকাকল্পে। মায়ের পূজা হয় কালী ধ্যান ও মন্ত্রে। দীপান্বিতা অমাবস্যার রাত্রে শতাধিক বছর ধরে হয়ে আসছে মহাপূজা। ছোট্ট অজানা সেই গ্রাম পরিচিত হল নতুন নামে— কালিকাপুর। মহিষাসুরমর্দিনী মায়ের কালী হয়ে ওঠা সচরাচর দেখা যায় না। কিন্তু কাটোয়ার কালিকাপুরে অধিষ্ঠাত্রী মা— অষ্টভুজা মহিষাসুরমর্দিনী কালী! --- মায়ের প্রতিষ্ঠা নিয়ে শতাধিক বছরের একটি প্রাচীন ভাষ্য প্রচলিত আছে। কালিকাপুরের অদূরে কুমরি নদীর তীরে কুমরি গ্রাম। সেই গ্রামের এক ব্রাহ্মণ প্রথম স্বপ্নাদেশ পান নদী থেকে মূর্তি তুলে প্রতিষ্ঠা করার। কিন্তু তিনি বিষয়টি গোপন রাখেন। অবিশ্বাসীকে মা ধরা দেননি। এরপর কালিকাপুরের এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ একই স্বপ্ন পান। তিনি দ্বিধা করেননি। নদীতে নেমে খুঁজে পান সেই অপরূপা মূর্তি। নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন মা’কে। সেই থেকে আজও চলছে পূজা। --- একবার ভয়াবহ খরার সময় গ্রাম ছিল সম্পূর্ণ শুষ্ক। হঠাৎ লেগে যায় আগুন। শুকনো ঘাস, খটখটে ঘরবাড়ি— মুহূর্তে ভয়ংকর অগ্নিকাণ্ড। পুকুর-বিল সব জলশূন্য। আগুন নেভানোর উপায় নেই। ঠিক তখন— ধানের জমির আল ধরে এক ছোট মেয়েকে হেঁটে আসতে দেখা যায়। এক বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করেন, “কোথায় যাচ্ছো মা? গ্রামে আগুন লেগেছে!” মেয়েটির উত্তর— “আমার কালিকাপুর পুড়ে যাচ্ছে, আর আমি যাব না?” মুহূর্তে আকাশে জমে ওঠে কালো মেঘ। নামে প্রবল বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির জলে নিভে যায় আগুন। শুষ্ক গ্রাম সজীব হয়ে ওঠে। পুকুরে জল ফিরে আসে। চাষ শুরু হয়। অভুক্ত কৃষকের পেটের আগুনও নেভে। --- মূর্তিটির প্রকৃত প্রাচীনত্ব নিয়ে কোনও লিখিত তথ্য নেই। তবে গঠনশৈলী, অলঙ্করণ ও দেবমণ্ডল দেখে অনুমান করা হয়— এটি পাল-সেন যুগের সমসাময়িক। পাল যুগের প্রস্তরমূর্তির সঙ্গে এর বিস্ময়কর সাদৃশ্য রয়েছে। অর্থাৎ, এই মূর্তি অন্তত সহস্র বছরের প্রাচীন। গবেষকদের মতে, বর্তমান কুমরি নদী আদতে সপ্তমাতৃকার এক মাতৃকা— কৌমারী নদী। সম্ভবত সেই কৌমারী রূপেই একসময় পূজিত হতেন এই দেবী। কালের নিয়মে প্রাচীন মন্দির ধ্বংস হয়ে যায়। মূর্তিটি নদীর জলে অবহেলায় পড়ে থাকে। অষ্টাদশ শতকের গোড়ায় কালিকাপুরবাসীরা মূর্তি উদ্ধার করে প্রতিষ্ঠা করেন। দেবীর নামানুসারেই গ্রামের নাম হয়— কালিকাপুর। বর্তমান মন্দিরের স্থান দান করেছিলেন যোগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। আজও বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত। --- এভাবেই কাটোয়ার কালিকাপুরে মহিষাসুরমর্দিনী মায়ের কালী রূপ— ভক্তদের আশীর্বাদ করে চলেছেন যুগের পর যুগ। জয় মা। 🙏

No comments:

Post a Comment