Wednesday, March 4, 2026

অগ্রদ্বীপ গোপীনাথ মেলার ইতিহাস

অগ্রদ্বীপ গ্রামের গোপীনাথের মেলা—প্রায় ৪৫০ বছরের প্রাচীন এক ঐতিহ্য, ভক্তি আর ইতিহাসের অপূর্ব মিলনক্ষেত্র। ভাগীরথীর পবিত্র তীরে অবস্থিত অগ্রদ্বীপ—এই স্থান জড়িয়ে আছে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য-এর স্মৃতির সঙ্গে। এখানে গোপীনাথের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহাপ্রভুর পার্ষদ গোবিন্দ ঘোষ। ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দের ফাল্গুন মাসে শ্রীচৈতন্য অগ্রদ্বীপে এসে ভক্ত গোবিন্দ ঘোষের কাছে অবস্থান করেন। সেই সময় মহাপ্রভু একটি কৃষ্ণবিগ্রহ নির্মাণ করিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁর নাম দেন গোপীনাথ। পরে নীলাচলে যাত্রার সময় মহাপ্রভুর নির্দেশে অগ্রদ্বীপেই থেকে যান গোবিন্দ ঘোষ। তিনি সারাজীবন নিজেকে উৎসর্গ করেন গোপীনাথের সেবায়। ১৫৮৮ খ্রিস্টাব্দে চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশী তিথিতে দেহত্যাগ করেন মহাপ্রভুর অষ্ট পার্ষদের অন্যতম এই মহান ভক্ত। তাঁর প্রয়াণতিথি স্মরণে প্রতিবছর এই দিনেই অনুষ্ঠিত হয় ‘চিড়ে মহোৎসব’ বা পারলৌকিক অনুষ্ঠান। লোককথা বলে, শিশুপুত্রের মৃত্যুর শোকে একসময় প্রায় উন্মাদ হয়ে পড়েছিলেন গোবিন্দ ঘোষ। তখন গোপীনাথ স্বপ্নে এসে তাঁকে আশ্বাস দেন—তিনি নিজেই পুত্ররূপে তাঁর শ্রাদ্ধ সম্পন্ন করবেন। সেই বিশ্বাস থেকেই গোবিন্দ ঘোষের মৃত্যুর পর গোপীনাথ এক মাস ধরে হবিষ্যান্ন গ্রহণ করেন এবং শ্রাদ্ধকালীন কাছা ধারণ করেন, পিণ্ডদান সম্পন্ন করার জন্য। আজও সেই প্রথা অটুট। প্রতি বছর চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশীতে গোপীনাথের বিগ্রহ মন্দির থেকে বের করে আনা হয় গোবিন্দ ঘোষের সমাধিক্ষেত্রে। মন্দিরের পাশেই রয়েছে তাঁর সমাধিস্থল। আর সেই উপলক্ষেই অগ্রদ্বীপে বসে ঐতিহ্যবাহী গোপীনাথের মেলা—যেখানে মিলিত হয় ভক্তি, সংস্কৃতি আর লোকউৎসবের আনন্দ। অগ্রদ্বীপ আগে থেকেই প্রসিদ্ধ ছিল বারুণী স্নান উৎসবের জন্য। চৈত্রের কৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে অনুষ্ঠিত এই বারুণী স্নান শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাবেরও বহু আগে থেকে প্রচলিত। বাংলা, বিহার, বাংলাদেশ ও ওডিশার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তরা এখানে আসতেন পুণ্যস্নানে অংশ নিতে। ইতিহাস বলছে, ১৮২৮ সালের বিধ্বংসী বন্যায় কৃষ্ণচন্দ্র রায় নির্মিত প্রাচীন গোপীনাথ মন্দির গঙ্গাগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সেই মন্দিরটি বর্তমান মন্দিরের প্রায় এক মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ছিল। বর্তমান মন্দিরটি নির্মিত হয় ১৮২৩ সালে, যশোরের বগচর নিবাসী গোপীনাথ পোদ্দারের আর্থিক সহায়তায়। আজও ভাগীরথীর তীরে দাঁড়িয়ে গোপীনাথের মন্দির শুধু একটি উপাসনালয় নয়—এটি ভক্তি, অলৌকিক বিশ্বাস, আর বাংলার শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল। এই ছিল অগ্রদ্বীপ গোপীনাথের মেলা—ইতিহাস আর আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য অধ্যায়।

অগ্রদ্বীপ কালকাপুর কালি মা

মায়ের নির্দেশ পেয়ে আর বসে থাকেননি সেই ব্রাহ্মণ। মায়ের ডাক কি কখনও উপেক্ষা করা যায়? একা একাই তিনি ছুটে গেলেন নদীর পাড়ে। “জয় মা!” বলে খরস্রোতা তটিনীর জলে ডুব দিলেন। হাতড়াতে লাগলেন চারিদিক। সময় কেটে যায়… শ্বাস ভারী হয়ে ওঠে… বুকের ভিতর চাপা যন্ত্রণা। তবে কি তিনি ব্যর্থ হবেন? তবে কি মা মিলবেন না? ঠিক সেই মুহূর্তে— নদীর তলদেশে দেখা দিল এক অপূর্ব জ্যোতি! ঘন কালো শিলায় খোদিত এক অপরূপ মাতৃমূর্তি! তিনি তুলে আনলেন সেই মূর্তি। কিন্তু স্বপ্নে তো মা বলেছিলেন— তিনি কালী রূপে পূজিত হবেন! এ যে অষ্টভুজা মহিষাসুরমর্দিনী! মহিষের পৃষ্ঠে আরোহিনী, অসুরবধে রত মাতা দুর্গা! কিন্তু রণক্ষেত্রে তো তিনিই রূপ বদল করেছিলেন বারবার। তিনিই দুর্গা, তিনিই কৌশিকী, তিনিই কাত্যায়নী, তিনিই গৌরী। তিনিই চণ্ডিকা, তিনিই কালী, তিনিই কালরাত্রি! সেই দিন থেকেই কুমরি নদীর তীরে সেই গ্রামে মা অধিষ্ঠিত হলেন— দুর্গা রূপে, অথচ কালিকাকল্পে। মায়ের পূজা হয় কালী ধ্যান ও মন্ত্রে। দীপান্বিতা অমাবস্যার রাত্রে শতাধিক বছর ধরে হয়ে আসছে মহাপূজা। ছোট্ট অজানা সেই গ্রাম পরিচিত হল নতুন নামে— কালিকাপুর। মহিষাসুরমর্দিনী মায়ের কালী হয়ে ওঠা সচরাচর দেখা যায় না। কিন্তু কাটোয়ার কালিকাপুরে অধিষ্ঠাত্রী মা— অষ্টভুজা মহিষাসুরমর্দিনী কালী! --- মায়ের প্রতিষ্ঠা নিয়ে শতাধিক বছরের একটি প্রাচীন ভাষ্য প্রচলিত আছে। কালিকাপুরের অদূরে কুমরি নদীর তীরে কুমরি গ্রাম। সেই গ্রামের এক ব্রাহ্মণ প্রথম স্বপ্নাদেশ পান নদী থেকে মূর্তি তুলে প্রতিষ্ঠা করার। কিন্তু তিনি বিষয়টি গোপন রাখেন। অবিশ্বাসীকে মা ধরা দেননি। এরপর কালিকাপুরের এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ একই স্বপ্ন পান। তিনি দ্বিধা করেননি। নদীতে নেমে খুঁজে পান সেই অপরূপা মূর্তি। নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন মা’কে। সেই থেকে আজও চলছে পূজা। --- একবার ভয়াবহ খরার সময় গ্রাম ছিল সম্পূর্ণ শুষ্ক। হঠাৎ লেগে যায় আগুন। শুকনো ঘাস, খটখটে ঘরবাড়ি— মুহূর্তে ভয়ংকর অগ্নিকাণ্ড। পুকুর-বিল সব জলশূন্য। আগুন নেভানোর উপায় নেই। ঠিক তখন— ধানের জমির আল ধরে এক ছোট মেয়েকে হেঁটে আসতে দেখা যায়। এক বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করেন, “কোথায় যাচ্ছো মা? গ্রামে আগুন লেগেছে!” মেয়েটির উত্তর— “আমার কালিকাপুর পুড়ে যাচ্ছে, আর আমি যাব না?” মুহূর্তে আকাশে জমে ওঠে কালো মেঘ। নামে প্রবল বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির জলে নিভে যায় আগুন। শুষ্ক গ্রাম সজীব হয়ে ওঠে। পুকুরে জল ফিরে আসে। চাষ শুরু হয়। অভুক্ত কৃষকের পেটের আগুনও নেভে। --- মূর্তিটির প্রকৃত প্রাচীনত্ব নিয়ে কোনও লিখিত তথ্য নেই। তবে গঠনশৈলী, অলঙ্করণ ও দেবমণ্ডল দেখে অনুমান করা হয়— এটি পাল-সেন যুগের সমসাময়িক। পাল যুগের প্রস্তরমূর্তির সঙ্গে এর বিস্ময়কর সাদৃশ্য রয়েছে। অর্থাৎ, এই মূর্তি অন্তত সহস্র বছরের প্রাচীন। গবেষকদের মতে, বর্তমান কুমরি নদী আদতে সপ্তমাতৃকার এক মাতৃকা— কৌমারী নদী। সম্ভবত সেই কৌমারী রূপেই একসময় পূজিত হতেন এই দেবী। কালের নিয়মে প্রাচীন মন্দির ধ্বংস হয়ে যায়। মূর্তিটি নদীর জলে অবহেলায় পড়ে থাকে। অষ্টাদশ শতকের গোড়ায় কালিকাপুরবাসীরা মূর্তি উদ্ধার করে প্রতিষ্ঠা করেন। দেবীর নামানুসারেই গ্রামের নাম হয়— কালিকাপুর। বর্তমান মন্দিরের স্থান দান করেছিলেন যোগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। আজও বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার মন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত। --- এভাবেই কাটোয়ার কালিকাপুরে মহিষাসুরমর্দিনী মায়ের কালী রূপ— ভক্তদের আশীর্বাদ করে চলেছেন যুগের পর যুগ। জয় মা। 🙏